Headlines News :
Home » » একজন সাদামনের মানুষের শেষ প্রস্তুতি ----ফরিদ আহমদ চৌধুরী

একজন সাদামনের মানুষের শেষ প্রস্তুতি ----ফরিদ আহমদ চৌধুরী

Written By zakigonj news on রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ | ১২:২৩ AM


মৃত্যু মানুষের জীবনে অবধারিত। কখনো তা স্বাভাবিকভাবে আসে, কখনো বা আকস্মিক। কখন কার মৃত্যু হবে তা আমরা কেউ জানিনা, সে জ্ঞান আমাদের নেই বলে সর্বদাই এর জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা খুব সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। দীর্ঘ জীবন পেয়েও কেউ মৃত্যুর জন্য যেমন প্রস্তুত হওয়ার সময় করতে পারে না আবার স্বল্পকালীন জীবনে অনেকে তার পরকালীন প্রস্তুতি সুসম্পন্ন করে মাওলার সাথে মিলনের জন্য তাঁর ডাকের অপেক্ষায় থাকেন। দূরদর্শী, পরিণামদর্শী লোকজন ছাড়া সে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদের বেলায় আমরা স্বাভাবিকভাবেই পরকালীন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা দেখি, প্রতিটি মুহুর্তকেই তারা তাদের জীবনের শেষ মূহুর্ত মনে করে অতিবাহিত করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সেটা চোখে পড়ে কম। সেটা তাদের সাধারণতার কারণে বা পরকালীন জীবন সম্পর্কে অদূরদর্শীতার কারণেই হতে পারে। তবে কিছু কিছু লোক সাধারণের কাতারে থেকেও খুব সাদাসিদে এবং সাধারণ জীবনযাপন করে মৃত্যুর জন্য সুন্দর প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হন, পরবর্তীদের জন্যও শিক্ষনীয় হয়ে ওঠেন। এই নিবন্ধে সে রকম সাদামনের একজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করবো। পূর্ব থেকেই যেন তিনি জানতেন তাঁর শেষ সময়ের কথা। যে কারণে সব প্রস্তুতি যেন তিনি নিজ থেকেই সম্পন্ন করে রেখেছিলেন। সাধারণ ধর্মানুরাগী পরিবারে জন্ম তাঁর। তাঁর বাবা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও দ্বীনদার। এলাকার প্রবীণ মুরব্বীগণ তাঁর বাবাকে খুব আল্লাহওয়ালা হিসেবে জানতেন। তিনি তাঁর বাবাকে ‘বাযি’ বলে ডাকতেন। এ ডাকে যেন আলাদা মধুই আছে। পিতার বার্ধক্যেই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে পরিবারের দায়িত্ব নেন। অকস্মাৎ পিতার ইন্তেকালের পর সে দায়িত্ব আরো ভারি আকারে কাঁধে নেন। জীবিকার জন্য সরকারি চাকুরি করতেন। চট্টগ্রাম ছিল তাঁর কর্মস্থল। পদের অপব্যবহার করে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপার্জনের অনেক সুযোগ তাঁর জীবনে আসলেও সততায় শতভাগ পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। এগুলোকে তিনি হারাম জ্ঞান করে জীবনভর প্রত্যাখান করেছেন। সময়-সুযোগে মানুষের উপকার করেছেন কোন বিনিময় না নিয়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় কর্মস্থলে সোনাদানাসহ অঢেল সম্পদ হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ আসলেও তা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকারী ঘুর্নিঝড় পরবর্তী সময়ে অসাধু লোকজন যখন লুতরাজ করে ‘বড়’ হওয়ার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত ছিল তখন তিনি বিপদগ্রস্থ মানুষের প্রতি সহযোগিতার উদার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজ কর্মস্থল থেকে ধন্যবাদিত ও পুরষ্কৃত হয়েছিলেন। সততা, পরোপকার, দুঃস্থজনে সহযোগিতা, ন্যায়নিষ্ঠতা ছিল তাঁর জীবনধারার অনুষঙ্গ। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে দ্বিতীয়বার অবসর গ্রহণ করেন ১৯৯৩ সালে। দ্বিতীয়বার এজন্য বললাম যে প্রথমবার নিজ থেকে একবার  অবসর নিয়েও পুনরায় কর্মস্থলে যোগ দেন ১৯৮৩ সালে। সততার জন্য পুনরায় কাজে যোগ দিতে কোন অসুবিধায় হয়নি। অবসরকালীন সময় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার জীবন যেভাবে কাটে সেভাবেই কাটতে লাগল। নিয়মিত ধর্মচর্চা, ইবাদত-বন্দেগী, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্প, পারিবারিক টুকিটাকি ইত্যাদি করেই সময় কাটালেন বেশ কয়েক বছর, আলহামদুলিল্লাহ্। একদিন পাশের বাড়ীর ‘মুরব্বী’কে ডেকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশের কবরের জায়গাটিতে গজে উঠা বছর দুয়েক বয়সী কদম গাছটি কাটা ও শিকড় উপড়ানোর জন্য বললেন। শিকড় রান্নার কাঠ হিসাবে পোড়ানোর জন্য ‘মুরুব্বী’কে দিয়ে দেন আর বলেন আমার সন্তানরা প্রায় সবাই প্রবাসী, ছোট ছেলে বাড়ী থাকলেও সে সময়মত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কিনা তাই তুমি দেখে রাখো এই জায়গায় যেন আমার কবর দেয়া হয়। গ্রামে মৃত্যুর খবর মসজিদের মাইকে এলান করা হয়। ফাঁকে ফাঁকে, সময় সুযোগে যাকে যে মহল্লার জন্য উপযুক্ত মনে করেছেন তাঁর মৃত্যু সংবাদ সেই মহল্লার মসজিদের মাইকে এলান করার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। আশপাশের প্রায় প্রতিটি মহল্লার একজন দু’জন এরকম দায়িত্বপ্রাপ্তির কথা তাঁর ইন্তেকালের পর বলেছেন। সমাজে প্রচলিত আছে কারো ইন্তেকালের পর গরীব মিসকিনদের ধান-চাল ও টাকা পয়সা বিলিয়ে দেয়ার। তিনি নিজ আয়োজনে হাজার পাঁচেক টাকার ভাংতি আয়োজন করে ঘরে তার পরিবারের হাতে দিয়ে বলেন, এগুলো রাখো, প্রয়োজনের সময় ভাংতি পাওয়া যায়না। হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার কারণে ঢাকায় হাসপাতালে যাওয়ার আগে তাঁর নিজের কাছে থাকা আতর ও সুরমা দিয়ে বলেন, তাড়াহুড়ার সময় ছোট খাটো জিনিষ সহজে পাওয়া যায় না, হাতের কাছে রাখো যাতে সময়কালে সহজে পাও। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন; পুকুর পাড়ে গিয়ে অপারগতা সত্বেও গাড়ি থেকে নেমে বাবা মা’র কবর যিয়ারত করে বলেন, যদি এ সুযোগ আর আমার জীবনে না হয় আবার! হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার পূর্বে ছোট ছেলেকে ডেকে বলেন,‘আমার মৃত্যুর খবর ফুলতলীতে পৌঁছাইও, ফুলতলী থেকে কেউ আসলে জানাযার নামাযে ইমামতি করতে বলিও। ঢাকার হাসপাতালে যাওয়ার আগে মসজিদের ইমাম সাহেবকে একদিন আলাপকালীন সময়ে তাঁকে গোসল দেয়ার জন্য বলে রেখেছিলেন। হজ্বের জন্য কেনা ইহরামের কাপড় ঘরে যতœ করে রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহারের জন্য। অনেক পুরনো হয়ে যাওয়ায় তা আর ব্যবহার না করার জন্য পরিবারের সদস্যদেরকে বলে রাখেন। মৃতদেহের খাটিয়া ঢাকার জন্য কুরআনিক আয়াত লেখা একটি চাদর ঘরে ছিল। এরকম চাদর দিয়ে মুর্দা ঢাকা নিয়ে এলাকায় পূর্বে ফিতনা হয়েছে। ফিতনা এড়ানোর জন্য তা ব্যবহার না করে তার নিজের ব্যবহারের কাশ্মিরি উলের চাদরটি তাঁর মৃতদেহ ঢাকার জন্য ব্যবহার করতে বলে রেখেছিলেন। বাড়ীতে নতুন ঘর যখন বানানো হয় তখন বড় ছেলেকে বলেছিলেন ঘরের সামনের দরজা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বড় দেয়ার জন্য যাতে প্রয়োজনে লাশ বহনের খাটিয়া ঘরের ভিতরে আনা ও বের করা যায় সহজে এবং সেমতেই ঘর তৈরি করা হয়েছিল। বাড়ীতে ছোট আকারের কোন খাট বা চৌকি ছিল না; যেটা মৃতদেহ গোসল দেয়ার উপযোগী সেরকম একটি খাট নিজ তদারকিতে কাঠমিস্ত্রিকে দিয়ে তৈরী করে রাখেন। তাঁর মৃতদেহ বাড়ীতে আসলে লোকজনের দেখার সুবিধার্থে বাড়ীর উঠোনে যেন রাখা হয় বললে পরিবারের অনুরোধে ঘরে রাখার অনুমতি দেন। হাসপাতালে যাবার আগে তাঁর ব্যবহৃত জিনিষপত্র ঘড়ি, পাঞ্জাবী, চাদর, লুঙ্গি ইত্যাদির কোনটি কাকে দিতে হবে বলে রাখেন। হাসপাতালে ইন্টেনসিভ কেয়ার থেকে সাধারণ বেডে নেয়া হয় কিছুটা সুস্থ হলে কিন্তু ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় ইন্টেনসিভ কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এর পরে আর তিনি সুস্থ হননি বরং ৭-৮ দিন পরে ইন্তিকাল করেন। যে স্বল্প সময়ের জন্য একটু সুস্থ হয়েছিলেন তাঁর জন্য চিন্তা না করার কথা বলেন আর পারিবারিক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ওসীয়ত নসীহত করেন। এ সময় কথা বলতে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। বারণ সত্বেও তিনি থেমে থেমে কথা বলছিলেন। তাঁর এক বোন পুত্রসন্তানহীনা ছিলেন, বড় ছেলেকে বলেন তাঁর প্রতি বিশেষ নজর রাখার জন্য। আরেক বোন আর্থিকভাবে কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন, বললেন তার প্রতিও বিশেষ খেয়াল রাখার। একমাত্র ছোট ছেলে দেশে, শিক্ষা সমাপন করার পর ভাল কোন দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য অন্য ছেলেদের প্রতি বলেন। মা ও বড় ভাইয়ের কথামত পরিবারের সবাইকে চলার পরামর্শ দেন। নিয়মিত নামাজ পড়ার কথা বলেন এবং মসজিদে নামাজে প্রথম কাতারে বসার নসীহত করেন। মিতব্যয়ী হওয়ার, সৎভাবে জীবন যাপন করা, সৎ ও ভালো লোকদের সাথে চলাফেরা করা ও সর্বদা আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করার নসীহত করেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি ‘আল্লাহর হাওলা’ বারবার বলছিলেন। একজন লোক মারা যাবার পর পরিবারের সদস্যদের উপর অনেক দায়িত্ব বর্তায়, অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোথায় দাফন করা হবে, কে তার জানাযার নামাজে ইমামতি করবে ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু তার বেলায় এমন কোন বিষয় তিনি বাকি রাখেননি যেটা পরিবারের লোকজনকে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর সাদা মনের প্রতিফলন যেন তাঁর শেষ বিদায়ে ফুটে উঠেছিল। তাঁর জানাযায় ইমামতি করেন হযরত আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) এর দ্বিতীয় ছাহেবজাদা ফুলতলী আলীয়া মাদ্রাসার সাবেক প্রিন্সিপাল তাঁর অন্যতম প্রিয়জন হযরত আল্লামা নজমুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। তাঁর দেখিয়ে দেয়া জায়গায় তাঁকে দাফন করা হয়েছে। যাকে গোসল দেয়ার জন্য অসিয়ত করেছিলেন, গোসলের জন্য তার নিজের তত্বাবধানে প্রস্তুতকৃত খাটে শুইয়ে তাকে গোসল দিয়েছেন। তাঁর দেয়া আতর সুরমা মাখিয়ে খাটিয়াসহ তাঁর মৃতদেহ ঘরে কিছু সময়ের জন্য রাখা হয়েছে। তিনি তাঁর পরিবার-পুত্রদের প্রতি যেমন অত্যন্ত সন্তুষ্ট ও প্রীত ছিলেন তেমনি পরিবার-পরিজন, পুত্র সন্তানগণও তাঁর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট ও প্রীত। তিনি আর কেউ নন, আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম মোঃ আব্দুল হক চৌধুরী। সিলেট জেলার জকিগন্জ থানার পরচক গ্রামে তাঁর জন্ম এবং সেখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তিনি ইন্তেকাল করেন ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া করি আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে যেন জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন, পাঠকের কাছেও সে দোয়ার মিনতি।
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad