Headlines News :
Home » » স্মরণ: আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরী

স্মরণ: আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরী

Written By zakigonj news on সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭ | ৫:০৮ PM

রহমত আলী হেলালী
পবিত্র আল- কুরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন সকল প্রাণিকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর চরম এ সত্যটি উপেক্ষা করার উপায় নাই কারও। কেউ আগে কেউ পরে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। এ ধারবাহিকতায় আমার শশুড় আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরী বৃহস্পতিবার ক্ষণিকের এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি ও অনেক প্রীতি। সে কারণে তাকে কিছুতেই ভূলতে পারছিনা। কখনো অন্যদিকে খেয়াল গেলেও বার বার 'নাই নাই' বলে কি একটা জিনিস মনের মাঝে কাজ করে। মনটা একটু স্থির করে চিন্তা করলে দেখি, সেই মায়াবী চেহারার আমার শশুড় আর নেই। অত্যন্ত সহজ সরল প্রকৃতির প্রিয় অভিভাবককে আমি কাছে থেকে বেশিদিন দেখার সুযোগ হয়নি। তিনি যৌবনের শুরুটা সিলেট শহরে শুরু করলেও শেষ জীবনটা কাটিয়েছে গ্রামের বাড়িতে। বিশেষ করে, আমার বিয়ের পূর্ব থেকেই তিনি গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন। ফলে আমি উনাকে তেমন একটা কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কেননা আমার আসা যাওয়া এবং থাকা ছিল সিলেট শহর কেন্দ্রিক। তবে আমার শাশুড় আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরীকে আমি যতদূর দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, তিনি একজন সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত মানুষ। নামাজ, রোজা ও ধর্মীয় বিধি নিষেধ তাকে পালন করতে আমি দেখেছি। সব সময়ই নিজে পরিশ্রম করে রোজি রোজগার করার চেষ্টা করতেন। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী মানুষ। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাকে অলসতা আকড়ে ধরতে পারেনি। অথচ একটি সম্ভ্রান্ত ও স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি এত পরিশ্রম না করলেও পারতেন। চাইলে অনেক সৌখিন জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো চরম পরিশ্রম করে নিজের পরিবার ও আজকের প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন বেশ কিছু স্মৃতি। শহরের বাসা করেছেন আর বাড়িতে করেছেন দৃষ্টি নন্দন ঘর। যা আজ তাকে ভূলতে দিচ্ছেনা। বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে একজন পরিশ্রমি অভিভাবক আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরীর কথা।মাঝে মধ্যে পারিবারিক বিষয় আশয় নিয়ে কথা হয়েছে তার সাথে। কথা বার্তায় তিনি আমাকে তার ছেলের মতো দেখতেন এমনটি মনে হত। বছর দুয়েক আগে আমার শাশুড়িকে নিয়ে তিনি হজ্জ্বে যাওয়ার সময় আমি উনার সাথে বসে একান্তে অনেক কথা বলেছি এবং উনার কথা দীর্ঘ সময় শুনেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হজ্জ্ব থেকে আসার পর আর উনার সাথে আমার একান্তভাবে বসে কোন কথা হয়নি। তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়ায় মাঝে মধ্যে দেখা হলে ছালাম ও কুশল বিনিময়ের মধ্যে কথাবার্তা সীমাবদ্ধ ছিল। গত কোরবানীর ঈদের পরদিন আমার সহধর্মিনী জাহানারা চৌধুরী ঝর্ণা আমার শাশুড় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান। আমি অনেক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও চলে যাই সিলেটে। গিয়ে দেখি নির্বাক হয়ে অসহায়ের মতো চেয়ে আছেন আমার শাশুড় আলহাজ্ব ফখরুল ইসলাম চৌধুরী। কোন কথা বার্তা, খাওয়া দাওয়া বা নড়াচড়া নেই। হাসপাতালে নিয়ে নাক দিয়ে খাওয়ার নল ও প্রশ্রাবের নল না লাগানোর জন্য আমার শাশুড়ের অনুরোধ থাকায় ভয়ে কেউ হাসপাতালে নিতে চাননি। তবুও উনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরদিন সিলেট নগরীর দরগা গেইটস্থ নুরজাহান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, তিনি স্টোক করেছেন। এছাড়া ডায়েবেটিক, কিডনি সমস্যা, কফ, শ্বাস কষ্ট সহ অনেক রোগ রয়েছে। চিকিৎসকরা তাই নাকে খাওয়ার নল ও প্রশ্রাবের নল লাগিয়ে দিয়ে চিকিৎসা শুরু করলেন।  কিন্তু কিছুতেই উনার শরীর উন্নতির দিকে যাচ্ছিলনা। এসময় আমি অনেক সময় তার কাছে কাটিয়েছি। দেখেছি একজন মানুষ মৃত্যু রোগে আক্রান্ত হলে কত যে অসহায় মনে হয়। এখনো আমার শাশুড়ের সেই নির্বাক চাহনিটা বার বার পীড়া দেয়। অসহায়ের মতো চেয়ে থাকা কোন ভাবেই ভূলতে পারছিনা। দীর্ঘ এ কয়েক দিনে আমি তার মূখ থেকে স্পষ্ট কোন কথা শুনতে পারিনি। তখন মনে মনে ভাবছিলাম হয়তো আল্লাহর কুদরতে আবারো সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। এ ক্ষেত্রে উনার ছোট ছেলে শরীফ মোহাম্মদ হোসেইন চৌধুরী তারেক চিকিৎসার জন্য নুন্যতম কার্পণ্য করেনি। উনাকে সুস্থ করে তুলতে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। চিকিৎসার পাশাপাশি দোয়া দুরুদ  ও খতমে শিফাসহ সব ধরণের চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি তার আদরের বাবা। জরুরী টিকিট নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে  ফিরেন উনার বড় ছেলে শরীফ মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী সাদেক ও বড় মেয়ে আনোয়ারা চৌধুরী পান্না । বাবাকে সুস্থ করে তুলতে তারাও যথেষ্ঠ চেষ্টা করছেন। মাত্র কয়েক দিনের জন্য দেশে আসলেও পুরো সময়টা কাটিয়েছেন বাবার পাশে। কিন্তু আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তার সেই "কুল্লু নাফসিন জইকাতুল মাউত" এই ঘোষণাকে বাস্তবায়ন করলেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল নয়টায় পরওয়ারদিগারের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রিয় অভিভাবককে এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। সিলেট নগরীর পূর্ব পীরমহল্লাস্থ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন)। ওইদিন দুপুরেই তাকে গ্রামের বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলার বিরশ্রী ইউনিয়নের পশ্চিম জামডহর গ্রামে নিয়ে আসা হয়। সেখানে জড়ো হন উনার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীগণ। সকলেই শেষ বারের মতো দেখে নিয়ে যান স্থানীয় শেরুলভাগ আনোয়ারুল উলুম মাদ্রাসা মাঠে। বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তখন আমি বার বার ভাবছিলাম মানুষ কি নিয়ে এ নশ্বর পৃথিবীতে এত আয়োজন করে। দুনিয়ার জন্য মানুষ পাগল হয়ে পড়ে। অথচ এ পৃথিবীতে আমাদের তো কিছুই নেই। এত সুন্দর ঘর বাড়ি আর বাসা রেখে আমার শাশুড়ের ঠিকানা আজ মাটির ঘরে। অথচ দুনিয়ায় উনার রেখে যাওয়া কোন কিছুই আজ কাজে আসছেনা। শুধুমাত্র সাদা কাফন-ই আজ তার শেষ সম্বল।
যেমনটি কবি বলেছিলেন---
মাটির বাড়ি মাটির ঘর মাটি হইবে বিছানা
আসছো একা যাইবা একা সংগে কেহ যাইবেনা।
কিন্তু যেদিন ডাক পরিবে কবর মাঝে শুইতে
যোগাড় কিছু করেছো বান্দা তাহার মাঝে বিছাইতে।
লক্ষ্য কোটি মুদ্রা ব্যয়ে করছো বালাখানা
হিরা মনি মুক্তা দিয়ে পালংকের ছামানা।
এমন জায়গায় যাইতে হবে
-সেই জায়গার নাই ঠিকানা
এমন ঘরে রইতে হবে -সেই ঘরে নাই বিছানা।
এমন জায়গায় যাইতে হবে
-সেই জায়গার নাই সাথী,
এমন ঘরে রইতে হবে
-সেই ঘরে নাই বাতি,
কোথায় হাটছো কোথায় চলছো
কোথায় যাইবা চলিয়া---
এই দুনিয়ার মায়ায় পড়ে যাইওনা তা ভুলিয়া।
বাবা গেছে দাদা গেছে কেউতো ফিরে আসবেনা,
এমনভাবে যাইতে হবে বুঝে কেন মন বুঝনা।
সাধের ছেলে চলিয়া যাবে আর তো আব্বা ডাকবেনা
প্রাণের বিবি চলিয়া যাবে আর তো ঘরে আসবেনা।
কাফনের কাপড় পড়তে হবে এ কাপড় তো থাকবেনা,
ধনী থাকো গরীব থাকো আজরাইল কাউকে ছারবেনা।
প্রিয় পাঠক: সবাই আমার সদ্য প্রয়াত শাশুড়ের জন্য দোয়া করবেন। পারলে সবাই অন্তত তিন বার সুরা এখলাছ পাঠ করে আমার শাশুড় সহ সকল মুরদেগানদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করবেন।
আর আমাদের সবার মনে রাখা উচিত, মৃত্যু পৃথিবীর সব সৃষ্টির শেষ পরিণতি। মৃত্যু এ দুনিয়ার সব জীবের পরিসমাপ্তি। আল্লাহতায়ালা মৃত্যুকে অবধারিত করে দিয়েছেন। মৃত্যু আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ন্যায়বিচার। সব সৃষ্টি এখানে সমান। এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রতিটি প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদনকারী। অতঃপর আমার দিকেই তোমাদের ফিরিয়ে আনা হবে।’ -সূরা আনকাবুত: ৫৭
জীবন ও মৃত্যুর ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহতায়ালার হাতে। কোনো প্রহরী, কোনো রক্ষী মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। সম্পদ, সন্তান, সাথী-সঙ্গী কিছুই কাজে আসবে না। মৃত্যুর হাত থেকে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ কেউই রেহাই পায় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, যদি তোমরা শক্তিশালী দুর্গেও থাক।’ -সূরা নিসা: ৭৮
মরণ নির্ধারিত সময়ে হঠাৎ করে এসে পড়বে। তাই মুমিন-মুসলমানরা মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত থাকেন। মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে সীমা লঙ্ঘন থেকে বিরত রাখে। বলা হয়েছে, যদি মানুষের জীবনে তিনটি বিপদ না থাকতো, তাহলে সে কখনও বিনয়ী কিংবা নত হতো না। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে- অসুখ কিংবা রোগ-বালাই, অভাব-অনটন। আর এ দু’টি বিপদ সত্ত্বেও মানুষ সীমা লঙ্ঘনের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে মানুষের দৃষ্টিতে পৃথিবী তুচ্ছ হয়ে যায়, তখন সে সীমা লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকে।
আলেমরা বলেন, মানুষের চোখের সামনে যখন মৃত্যু ভাসমান হবে, তখন সে আল্লাহর নেয়ামতসমূহকে ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবে। যে ব্যক্তি মৃত্যুকে স্মরণ করে তার হৃদয় কোমল হয়। তার কাজ ও অবস্থা সৎ হয়। গোনাহ করার সাহস করে না। ফরজগুলো নষ্ট করে না। পৃথিবীর চাকচিক্য ও জৌলুস তাকে ধোঁকায় ফেলে না। সে তার রবের ও সুখময় জান্নাতের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
আর যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা ভুলে থাকে তার হৃদয় নির্মম ও পাষাণ হয়ে যায়। সে দুনিয়ার মোহে পড়ে। তার আমল-আখলাক খারাপ হয়। আশা দীর্ঘায়িত হয়। তাই মৃত্যুকে স্মরণ করা অনেক বড় উপদেশবার্তা। হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ৫টি জিনিস তোমার জীবনে আসার আগে ৫টি জিনিসের মূল্যয়ন করবে। যথা- যৌবনকে বৃদ্ধকাল আসার পূর্বে, সচ্ছ্বলতাকে অভাব আসার আগে, সুসময়কে দুঃসময়ের আগে, সুস্থতাকে অসুস্থতার আগে, জীবনকে মৃত্যু আসার আগে।
মৃত্যুর প্রস্তুতির ভেতরেই নিহিত আছে প্রকৃত সৌভাগ্য, অপার সুযোগ ও চূড়ান্ত সফলতা। কেননা, মৃত্যু জান্নাতের অথবা জাহান্নামের সর্বপ্রথম ধাপ। মৃত্যুর প্রস্তুতি হিসেবে শরিয়তের বিধিবিধান ও ফরজগুলো সর্বাগ্রে সংরক্ষণ করতে হবে। কবিরা গোনাহ ও বিভিন্ন পাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। সৃষ্টজীবের যাবতীয় হক আদায় করতে হবে। এক কথায়, যে কোনো সময় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা চাই। কল্যাণের সঙ্গে জীবনাবসান হওয়াই মৃত্যুবরণকারীর জন্য সৌভাগ্য।
হাদিসে আছে, ‘আমলগুলো শেষ পরিণতি অনুসারেই বিবেচিত হবে।’ হজরত মুআজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ বলেন, যার শেষ কথা হবে- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ সে জান্নাতে যাবে।’ -আবু দাউদ
পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যেন চলার পথে সর্বদা মৃত্যুর কথা স্মরণ রাখতে পারি এবং এখন থেকে হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর পূর্বে যেন মৃত্যুর সামানা তৈরি করতে পারি। আমীন।
লেখক: রহমত আলী হেলালী, যুগ্ম সম্পাদক- জকিগঞ্জ প্রেসক্লাব, সিলেট। মোবাইল: ০১৭১৫-৭৪৫২২২
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad