Headlines News :
Home » » “মাদারখালের পোনা জকিগঞ্জের সোনা”

“মাদারখালের পোনা জকিগঞ্জের সোনা”

Written By zakigonj news on বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০১৫ | ৫:২১ AM


আল মামুন
’বাঁশ মাছ সুপারি জকিগঞ্জের বেটাগিরি’ এক সময় এ প্রবাদ ছিল স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে। বছরে একবার এখানে সুপারি সুসংবাদ নিয়ে আসলেও ধান ও মাছের প্রাচুর্যতা ক্রমেই কমছে। এককালে নানা জাতের সুস্বাদু দেশি মাছে ভরা ছিল জকিগঞ্জের পুকুর-নদী-খাল-বিল। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, ক্রমাগত পরিবেশদূষণ আর নির্বিচারে জলাশয় ভরাটে একদিকে যেমন সংকুচিত হয়ে আসছে দেশি মাছের আবাসভূমি, অন্যদিকে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্বিচারে ডিমওয়ালা মাছ ও রেণু পোনা নিধনে দেশি প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। আশির দশকে নানাবিধ কারণে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মৎস্য সম্পদ বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। হ্যাচারীতে কৃত্রিম প্রজনের মাধ্যমে রেণু, রেণু থেকে পোনা আর পোনা থেকে বড় মাছ চাষের উদ্যোগ নেন জকিগঞ্জের মাদারখালের কয়েকজন উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তাদের একজন নিয়ামত আলী। বয়স তখন বড়জোর ১২ কি ১৩ হবে। সদ্য স্বাধীন দেশ। লেখাপড়া করেননি। কাজকাম নেই। কাজের সন্ধানে কুশিয়ারার ওপার ভারত চলে যান। ওখানেই শেখে নেন মাছের পোনা ক্রয়-বিক্রির কাজটা। দেশে এসে শুরু করেন এ কাজ। মানুষ তখন  হাসে! কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি এখন জিরো থেকে হিরো। বাচ্চাদের লেখাপড়া, বিয়ে সাদি, পাকা ঘর, সুখের সংসার সবই হয়েছে পোনায়। নিয়ামত আলী যেন জকিগঞ্জের পোনা মাছের ব্যবসার এক নেয়ামত হিসেবে দেখা দেন। তার পথ ধরে এ ব্যবসায় আসেন জামাল আহমদ, আব্দুস সামাদ, নূর আহমদ, সুনাম উদ্দিন, কবির আহমদ, হেলাল আহমদসহ দুই শতাধিক পরিবারের সদস্য তিন শতাধিক পুকুর মাচের পোনা ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যবহার করেন।  জানা যায়, জকিগঞ্জে উম্মুক্ত জলাশয়ের সংখ্যা-৮৭। জকিগঞ্জের মাদারখালে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি পোনা মাছ ক্রয়-বিক্রি হয়। ২০০৮ সালে জকিগঞ্জে বাণিজ্যিক মাছের খামার ছিল ৬টি বমর্তমানে এ সংখ্যা ৪৮। জকিগঞ্জের আড়াই লক্ষাধিক লোকের জন্য বার্ষিক মাছের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪৭৫০ মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় চাহিদার বেশি মাছ। জকিগঞ্জের ৬৬৬৭ টি পুকুরের ৭শ ২১ হেক্টর আয়তনে ১৯৫০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। বিগত বছরে চার হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন মাছ জকিগঞ্জে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। জকিগঞ্জের মাদারখালে রেণু ও পোনা উৎপাদনে রীতিমত নিরব বিপ্লব ঘটেছে। ফলে এলাকায় মাছের ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এখানে। বিভিন্ন অঞ্চলের মাছ চাষীরা মাদারখালের পোনা বাজারে ভিড় করে থাকেন পোনা সংগ্রহের জন্য। উপজেলায় পোনা উৎপাদন এখন প্রধান আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে পুকুরে পোনার চাষ করা হচ্ছে। পাঁচ-ছয়দিন বয়সী রেণু থেকে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় পাঁচ হাজার টন। জলাশয়গুলোয় রেণু থেকে পোনা বিক্রি করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাছ চাষীদের কাছে। পুঁটি, কাতলা, দেশী শিং, মাগুর, ঘনিয়া (ঘইন্যা), সিলভার, ভির্গেট, তেলাপিয়া, রুই, পাঙ্গাশ, কার্প, কমন কার্প, মৃগেল মাছের পোনা জাত ও মানের কারণে ১০০-২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়ে থাকে। পোনা বিক্রির জন্য শেওলা-জকিগঞ্জ সড়কে মাদারকালের ভূইয়ার বাজারের কাছে বাজার তৈরি হয়েছে। এ বাজার বসে প্রতিদিন ভোরে আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পোনা বিক্রির হাটও শেষ হয়ে যায়। মৎস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় এখন পোনা মাছের বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে। জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট সিলেটসহ আশপাশের বেশকিছু অঞ্চলের মাছচাষীরা পোনা সংগ্রহ করেন এখান থেকে। প্রতিদিন এ বাজারে বিভিন্ন এলাকার মাছচাষীরা লাখ লাখ টাকার মাছের পোনা বেচাকেনা করে থাকেন। মাছচাষী মোস্তাক আহমদ জানান, জকিগঞ্জে উৎপাদিত মাছের পোনা সাধারণত দ্রুত বাড়ে। নতুন পুকুরে চাষাবাদ করা হলেও পানির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। ভোরে পোনা সংগ্রহ করে মিনি ট্রাকে করে বিশেষ ব্যবস্থায় পোনা নিয়ে পুকুরে চাষাবাদ করা হচ্ছে। পোনা ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন জানান, রেণু ও পোনার পাশাপাশি কিছু বড় মাছও বিক্রি হয় মাদারখালে। এ পোনা মাছ বাজারে প্রায় সারা বছর বেচাকেনা হলেও মূলত মার্চের প্রথম থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পুরোদমে জমজমাট থাকে। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলার মাছ চাষীরা এ পোনা কিনে থাকে। মাছ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, উপজেলায় পোনা কিনতে পাইকারি ব্যবসায়ীরাও সকালেই ভিড় করেন। মাছ চাষীর কাছে বিক্রি করলে লাভ বেশি পাওয়া যায়। পোনা উৎপাদনকারী শফিকুল ইসলাম জানান, জকিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মাছ চাষীরা তার হ্যাচারি থেকে বিভিন্ন রেণু পোনা সংগ্রহ করে থাকেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি মাছের ব্যবসায়ী এবং মাছ চাষীরা পোনা সংগ্রহ করেন। জাত ও পোনার মান অনুযায়ী ১০০-২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়ে থাকে। আবার বাজারে পোনার সংগ্রহ কম হলে কখনো দাম বেড়ে যায়। তিনি বলেন, উপজেলার প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ মাছ চাষের সঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছেন। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। পোনার চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে এখানকার মাটি ও পানির কারণে। মাদারখালে কৃত্রিমভাবে ফোটানো রেণু থেকে পোনা খুব সহজে অন্যান্য পুকুরে বেড়ে ওঠে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, জকিগঞ্জে বেসরকারী নার্সারীর সংখ্যা ৮২টি। এখানে ১”-৭” পর্যন্ত বড় করে পোনা বিক্রি করা হয়।  ২০১৪ সালে এখানে দুই কোটি ৫০ লক্ষ পোনা উৎপন্ন হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। হাওড় অঞ্চলে মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় জকিগঞ্জে ৫টি বিল নার্সারীতে কমপক্ষে ৫ লক্ষ রেনু উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে পাঁচ লক্ষ টাকা। পোনা মাছ উৎপাদনে বড় সমস্যা হচ্ছে পানির সংকট। শুস্ক মৌসুমে এখানে পুকুরে পানি শুকিয়ে যায়। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকেন পোনা ব্যবসায়ীরা। কুশিয়ারা নদীর পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে কিংবা গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা হলে এবং সময় মতো ব্যাংক সুবিধা পাওয়া গেলে জকিগঞ্জের মাদারখালে পোনা চাষে আরো সাফল্য আসবে।
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad