Headlines News :
Home » » জকিগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকায় চলাচল

জকিগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৌকায় চলাচল

Written By zakigonj news on মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৪ | ৩:৪৮ PM

জাহানারা চৌধুরী ঝর্ণা
বরাক সৃষ্ট সুরমা ও কুশিয়ারা নদী বেষ্ঠিত জকিগঞ্জ উপজেলায় হাওর-বাঁওর নদ-নদী ও খাল-বিল ছিল প্রচুর। তাই আজ থেকে মাত্র দেড় একযুগ আগেও বর্ষা মৌসুমে জকিগঞ্জ উপজেলার গ্রাম-গঞ্জের মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নৌকা। তখনকার সময়ে উপজেলার এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে নৌকা-ই ছিল একমাত্র ভরসা। তখনকার সময় জকিগঞ্জের প্রত্যান্ত অঞ্চলের মানুষ নিজ নিজ প্রয়োজনে নৌকা তৈরী করে বা বাজার থেকে ক্রয় করে রাখতেন। সে সময় জকিগঞ্জের ভাটি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত বারহাল, কাজলসার, বিরশ্রী, খলাছড়া ও মানিকপুর ইউনিয়নের সিংহভাগ গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে অন্তত: একটি নৌকা দেখা যেতো। কোন কোন বাড়িতে একাধিক নৌকাও ছিল। সিলেটের মধ্যে নৌকা বিক্রির হাট হিসেবে সমাধিক পরিচিত ছিল উপজেলার কাজলসার ইউনিয়নের “চৌধুরী বাজার”। বর্ষা মৌসুমে এ বাজারে সিলেটের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মানুষ নৌকা ক্রয়-বিক্রয় করতে আসতেন। সাপ্তাহের বুধ ও রোববার চৌধুরী বাজারে গেলে দেখা যেত বিক্রির জন্য শতশত নৌকা সারি ধরে রাখা এবং ক্রেতা-বিক্রেতার উপচে পড়া ভীড়। কালের আবর্তে আজ তা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন আর চোঁখে পড়েনা সে দৃশ্য। নব্বইয়ের দশকে জেলা বা উপজেলা সদর থেকে কাজলসার ইউনিয়নের কামালপুর, জামুরাইল, কড়ইমুড়া ও চানপুরসহ আশপাশ গ্রামে যেতে সাদিরখাল নামক ব্রীজের নিকট নামতে হতো। সেখানে নামলে দেখা যেতো সারি সারি নৌকা নিয়ে মাঝিরা বসে আছে। এখানে নেমে সে এলাকার মানুষ দল-বেঁধে নৌকায় করে বাড়ি ফিরতেন। যাত্রীদের বাড়ির দূরত্ত্ব অনুযায়ী ১০/২০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। তখন এতদঞ্চলের মানুষের নৌকা ষ্টেশন ছিল সাদিরখাল। কামালপুর ও জামুরাইলের মানুষ কোথায়ও যাওয়ার সময় নিজ নিজ নৌকায় আসতে হতো সাবেক মন্ত্রী এম.এ.হক সাহেবের বাড়ির নিকটের ব্রীজে। এখানে ছিল এই দুই গ্রামের নৌকা ষ্টেশন। কোন কোন মাঝি আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাকতো “ঐ হাদিখাল”। তখন এ বাড়িতে কোন যাত্রী থাকলে বলতেন “ও নৌকা আমার বাড়িত আইয়ও”। এভাবেই উপজেলার ভাটি অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করতেন। গ্রাম-গঞ্জে পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট না থাকায় তখন নৌকাই ছিল বর্ষা মৌসুমের একমাত্র অবলম্বন। যার দরুন ভাটি অঞ্চলের মানুষ বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস নৌকায় চলাচল করতেন। আর শুকè মৌসুমে ছোটখাটো রাস্তা, গোপাট বা আবাদ জমি দিয়ে হেঁটে চলাচল করতেন। প্রবীণদের কাছ থেকে শুনা যায়, আগেকার সময়ে মানুষ নৌকায় চলাচলের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক স্থানে বাড়ি-ঘর তৈরী করতেন। সে সময়ের বিয়ে শাদীতে গর্ব সহকারে বলা হতো বর বা কনের বাড়ি “নাওয়ে ঘাটে”। তখন এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে কিংবা এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পৌঁছার প্রধান অবলম্বন ছিল নৌকা। শত শত মাঝি তখন এই পেশার উপর নির্ভর করেই তাদের জীবিকা অর্জন করত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নৌকার প্রচলন প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে কদাচিৎ পাল বা মাছ ধরার ছোট ডিঙ্গি নৌকার দেখা মিললেও খাল-বিল ও হাওরে পাল তুলে নৌকা চলাচলের দৃশ্য এখন বিরল। পাল তোলা আর ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা এখন কেবলই স্মৃতি। জকিগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখন আর নৌকায় যাতায়াত করতে হয়না। কিছু কিছু এলাকায় এখনও সড়ক যোগাযোগ অনুন্নত থাকায় বর্ষা মৌসুমে নৌকায় চলাচলের প্রয়োজন হয়। তবে নদী-খালগুলো অবৈধ দখলদারদের হাত জিম্মি হয়ে পড়ায় নৌকাগুলো আর চলাচল করতে পারেনা। এলাকার লোকজন জানান, নদী-খাল দখল করার জন্য একটি স্বার্থান্বেষী মহল সব সময় ওঁৎপেতে থাকে। এদের হাত অনেক লম্বা। সব কিছু ম্যানেজ করে তারা অনায়াসেই দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। তারা বলেন, কিছুদিন আগেও উপজেলার বিভিন্ন খালের বুকে নৌকা চলত। অথচ দখল-দূষণে এখন সেটি মৃতপ্রায়। খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। এভাবেই জকিগঞ্জে ছোট-বড় সব ক’টি খাল দখলদারদের আয়ত্তে চলে যাওয়ায় জকিগঞ্জের গ্রামাঞ্চলের মানুষের নৌকায় চলাচল এখন শুধু স্মৃতি। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে নদী-খাল পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি অঞ্চলের প্রাণ হচ্ছে নদী বা খাল। মানব দেহের শিরা-উপশিরার মতো এই নদী-খাল বিলগুলো আমাদের বেঁচে থাকতে, জীবন ধারণে সহায়তা করে। সে কারণেই অবৈধ দখলদারদের হাতে এগুলোর অপমৃত্যু হলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad