Headlines News :
Home » » শিক্ষক আব্দুল করীম হত্যাকান্ড এ কেমন বর্বরতা? এ কেমন নিষ্ঠুরতা??

শিক্ষক আব্দুল করীম হত্যাকান্ড এ কেমন বর্বরতা? এ কেমন নিষ্ঠুরতা??

Written By zakigonj news on বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০১৪ | ১:৩৫ PM

॥ রহমত আলী হেলালী ॥

যে কোনো হত্যাই নিষ্ঠুরতা। কিন্তু জকিগঞ্জের তিরাশি গ্রামের জনপ্রিয় স্কুল শিক্ষক আব্দুল করীমের নির্মম হত্যা কান্ডকে শুধু নিষ্ঠুরতা বললে কম বলা হয়। বলার আসলে ভাষা নেই। আমরা স্তম্ভিত, আমরা ভাষাহীন। সমাজের কারও কারও মধ্যে কী পরিমাণ ঘৃণা ও জিঘাংসা জন্মালে কেউ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যায়। কীভাবে এক মায়ের পেটের ভাইয়েরা স্বার্থের বশে চরম বর্বরতা ঘটাতে পারে, এ ঘটনাটি তারও একটা সূচক। সূচকটা আমাদের সতর্ক হতে বলে, হুঁশিয়ার হতে বলে। আমরা জানি, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যখন ধ্বংসের খুব নিকটবর্তী করেন তখন তার থেকে মায়া-মমতা উঠিয়ে নেন। তার সকল অপকর্ম, আর নৃশংসতা গুলো চোঁখের আড়াল করে দেন। ফলে সে কতটুকু অমানবিক ও ঘজন্য কাজ করছে তার বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে। আর এই নৃশংস, অমানবিক ও জঘন্য কর্মকান্ড বিবেকবানদের করে তোলে হতবাক আর আবেগ আপ্লুত। কিন্তু অপরাধীরদের নিকট এমন কর্মকান্ড হয়ে উঠে এক ধরনের উল্লাস আর উপভোগের বস্তু। এমন নির্মম ঘটনা মানুষকে কাঁদালেও অপরাধীরা থেকে যায় নিঃলর্জ্জ। আর যারা এভাবে মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে অবশ্য আল্লাহ তায়ালা কুরআনে তাদেরকে পশুর সাথেও তুলনা করতে রাজি হননি, কুরআনে-বালহুম আদল” বলা হয়েছে, অথ্যাৎ তারা পশু তথা চতুষ্পদ জন্তু থেকে আরো নিকৃষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি জকিগঞ্জের জনপ্রিয় স্কুল শিক্ষক আব্দুল করীমের হত্যাকান্ড সেই মহাবিপর্যয়েরই আলামত? আমরা মিডিয়ায় মাধ্যমে জানলাম, গত ৯ জুলাই মঙ্গলবার ভোর রাতে জকিগঞ্জ উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের তিরাশী গ্রামের মৃত মুজম্মিল আলীর বড় ছেলে ও জগন্নাথপুর সরুপচন্দ্র সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল করীমকে আপন ভাইয়েরা নিজ গৃহে রাতব্যাপী নির্মম নির্যাতন চালিয়ে পুরো শরীরের হাড়-জোড় ভেঙ্গে দেয়। এরপরও ভোর পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় পায়ের রগ ও অন্ডকোষ ছিড়ে ফেলেন ভাইয়েরা। এমন নির্মম হত্যাকান্ডের পর ঘটনাটি চাঁপা দিতে হার্ডএ্যাটাক করে মারা গেছেন বলে মানুষকে বোকা বানিয়ে জানাজা শেষে দাফন করা হয়। কিন্তু মানুষ তা মেনে নিতে পারেনি। দাফনের পর থেকে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয় সর্বমহলে। কেউ মুখ না খুললেও মুখ খোলেন কিছু সৎ সাহসী ব্যক্তি ও কলম সৈনিকরা। আর এ থেকে বেরিয়ে আসে হত্যাকান্ডের বিষয়টি। মিডিয়া ও এলাকাবাসীর বদৌলতে সরেজমিনে পুলিশ গেলে জব্দ করা হয় হত্যাকান্ডের বিভিন্ন আলামত। তখন স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগীতায় নিহত আব্দুল করীমের ছোট ভাই ফাহিমের স্ত্রী ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রোজিনা বেগম বাদী হয়ে জকিগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর শিক্ষক হত্যার বিচারের দাবীতে উত্তাল হয়ে উঠে জকিগঞ্জের সর্বত্র। দাবী উঠে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ১৫ দিন পর গত ২৩ জুলাই বুধবার তাঁর লাশ উত্তোলন করা হয়। লাশ উত্তোলনের পর বেরিয়ে আসে হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক চিত্র। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জকিগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) দেলোয়ার হোসেন কর্তৃক লাশের প্রাথমিক ছুরতহাল রিপোর্টে দেখা যায়, নিহত করীম স্যারের বাম হাতের কুনুই ও কবজি ভাঙ্গা, পেটের বাম পাশে জখন, বাম পা ভাঙ্গা, ডান পায়ের হাটুর উপরে জখম, ডান পায়ের রগ কাটা, অন্ডকোষের কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। পীঠের এক পাশে কাঁধের নীচে রক্তাক্ত জখম, ডান পায়ের রানের উল্টা দিকে আঘাতের দাগ, ডান পার নীচে উল্টা দিকে ছেচা জখম, মাথার বাম পাশ ও পিঠে জখম দেখা যায়। লাশ কিছুটা ফুলে গেলেও আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট দেখলেন এলাকার শতশত মানুষ। সেদিন মানুষের মুখ থেকে শুনলাম, শিক্ষক আব্দুল করীম হত্যাকান্ডের সাথে ছোট ভাই আব্দুর রহীম ছাড়াও তাঁর অপর ভাই সিলেট বিমানবন্দর থানার এসআই আব্দস শাকুর ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে শাকুরকে নিহত করীম স্যার কর্মজীবনের শুরুতে মসজিদে ইমামতির সময় নিজের টিফিনের ভাত প্রথমে তাকে খাওয়ানোর পর পরবর্তীতে ভাত থাকলে তিনি খেতেন। শুধু তাই নয়, এসআই শাকুর এ পর্যন্ত চলে আসার পেছনে যার শক্ত হাত ছিল তিনি হলেন তাঁরই নির্মম নির্যাতনে নিহত বড় ভাই আব্দুল করীম। আমরা রহিমের কথা বাদ-ই দিলাম, কেননা সে একজন অশিক্ষিত লোক এবং  নিহত করীম স্যার তার স্ত্রীকে কিছুদিন পূর্বে তাপ্পড় মেরেছেন তাই সে ক্ষোব্ধ হয়ে এমনটি করেছে। কিন্তু করীম স্যারের এত আদরের ভাই এদেশের আইন শৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা পুলিশের এসআই শাকুর কিভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটালো? আমরা যতদূর জেনেছি তা থেকে পরিস্কার প্রতিয়মান হয় যে, খোদ এসআই শাকুরের একক সিদ্ধান্তে এবং সাহসিকতায় এই হত্যাকান্ড ঘটে। নতুবা রহিম এমন হত্যাকান্ড ঘটানোর দুঃসাহস দেখাতে পারতো না। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় করীম স্যারের উপর এই পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে তারই ছোট ভাই রহিম ও শাকুর। সবচেয়ে জঘন্য বিষয়টি হচ্ছে এসআই শাকুর খুন করে নির্দিধায় কর্মস্থলে এসে ডিউটি করছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর একজন সদস্য হয়ে এরকম নেক্কারজনক ও বর্বোরচিত কাজ গোটা জকিগঞ্জবাসীকে হতবাক শুধুই করেনি, বরং অপমানিত করেছে। হার মনিয়েছে আইয়্যামে জাহেলিয়াতকে। আর জকিগঞ্জ থানা পুলিশ নির্যাতনকারীদের পরিবর্তে গ্রেফতার করেছে বাদিনীর স্বামী ফাহিমকে। অভিযোগ রয়েছে পুলিশ আসামীদের সহযোগীতা করার। কিন্তু পুলিশ প্রশাসনকে মনে রাখা উচিত নিহত করীম স্যার হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জকিগঞ্জে যে জনতার উত্তাল ঢেউ লেগেছে তা আর কখন চোঁখে পড়েনি। আমরা পুলিশের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, এমন নৃশংস ঘটনায় আসামীকে খুঁজছি ও দারোগা শাকুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আবেদন করছি এটা পুলিশের মুখে শুভা পায়নি। বরং একজন মানুষ হিসেবে পুলিশকে তাৎক্ষণিক অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে যা প্রায়োজন তা করা উচিত ছিল বলে আমরা মনে করি। লোক মূখে শুনা যাচ্ছে, লাশ কবর থেকে উত্তোলনের দিনই আসামী রহিম ও শাকুর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এসেছেন। সচেতন মহল তাদের এই জামিন ও বাদিনীর স্বামীর আটকের বিষয়টি একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করছেন। তাদের ধারণা বাদিনীকে চাঁপে ফেলে এখন আসামীরা আপোষ করার চেষ্ঠা করবে। তবে আমরা জানি মজলুমের জন্য  দুনিয়ার সাহায্য কখনো কখনো পরীক্ষার জন্য সংকোচিত হয়ে আসে, তখন মজলুমের শান্তনার জন্য মহানবী (সা:) এর সেই ঐতিহাসিক হাদীসের বানী এসে আমাদের মাঝে হাজির হয়। হযরত আবু মুসা (রা) থেকে বর্ণীত- রাসুল (সা:) বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তিনি যখন তাকে পাকড়াও করেন তখন আর রেহাই দেননা। এরপর রাসুল (সা:) সুরা হুদ এর ১০২ নং আয়াত তেলাওয়াত করলেন, যার অর্থ-” আর তোমার রব যখন কোন জালিম জনবসতিকে পাকড়াও করেন, তখন তার পাকড়াও এ রকমই (কঠিন) হয়ে থাকে। তার পাকড়াও বড়ই কঠিন ও নির্মম।” বিশ্বাসী বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তনা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতেই জালেমকে লাঞ্চিত করার ওয়াদা করেছেন। তার শাস্তি বড় বড়ই কঠোর ও নির্মম। তিনি ”কাহ্হার তার শাস্তি কতইনা বেদনাদায়ক জালেমদের জন্য। জকিগঞ্জ তথা পূর্ব সিলেটের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ আজ এমন প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে। করীম স্যারে স্ত্রী-সন্তান দুনিয়াতে না থাকলেও অসখ্য ছাত্র-ছাত্রী ও সহপাঠি গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ঢেলে জায়নামাজ ভাসাচ্ছে। এ খবর আল্লাহ ছাড়া কে জানে। সবচেয়ে দুঃখের যে বিষয়টি হচ্ছে তা হলো, শিক্ষক আব্দুল করীম হত্যাকান্ডের মূল রহস্যকে আড়ালে রেখে কতিপয় লোক পরকীয়ার জন্য হত্যাকান্ড ঘটেছে বলে প্রচার করছে। অথচ যে মহিলাটির সাথে পরকীয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে তাকে দেখলে যে কেউ বলবে এই মহিলার সাথে শিক্ষক আব্দুল করীম পরকীয়া করার কথা নয়। আর যদি পরকীয় হয়েই থাকে তাহলে ঐ মহিলাটি ঘরে থাকাবস্থায় শুধু নিজ ভাইকে টান্ডা মথায় হত্যা করা হলো আর মহিলাটিকে একটা তাপ্পড়ও মারলেন না। যা নিয়মিত হতবাক হওয়ার কথা। শুধু এখানেই শেষ নয়, যার স্ত্রীর সাথে পরকীয়া বলে প্রচার করা হচ্ছে সে তাকে না মেরে অপর ভাইয়েরা কেন মারে? এছাড়াও আরেক অনেক বিষয় সচেতন মহলকে ভেবে তুলেছে। সচেতন মহল মনে করেন, এর পেছনে নিশ্চয় কোন বড় ধরণের স্বার্থ রহিম ও শাকুর গংদের রয়েছে। পুলিশ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তদন্ত করলে তা অকপটে বেরিয়ে আসবে বলে তাদের ধারণা। এদিক বিবেচনায় আমরা মনে করি, নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা, হত্যা-সন্ত্রাস-নৈরাজ্য আর সমাজ ও মানবতাবিরোধী কর্মকান্ড আজ শহর-গ্রাম সর্বত্র যেভাবে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে, অনতিবিলম্বে তার রাশি টেনে ধরতে না পারলে আমাদের সামাজিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। এ বিষয়ে সরকার, সুশীল সমাজ ও সচেতন, বিবেকমান মহলকে অধিকতর সচেতন হতে হবে। কঠোর ও নিরপেক্ষ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি এ লক্ষ্যে সমন্বিত ও কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী।
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad