Headlines News :
Home » » জকিগঞ্জ থেকে হারিয়ে গেছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘ঢেঁকি’

জকিগঞ্জ থেকে হারিয়ে গেছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘ঢেঁকি’

Written By zakigonj news on রবিবার, ১৮ মে, ২০১৪ | ৯:৩৯ PM

জাহানারা চৌধুরী ঝর্ণা
জকিগঞ্জ থেকে সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে গ্রাম-বাংলার ঐহিত্য ‘ঢেঁকি’। দুই যুগ পূর্বে জকিগঞ্জের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ধান বানার ‘ঢেঁকি’ থাকলেও আজ আর নেই। যান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এখন গ্রাম-বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাতায় স্থান করে নিয়েছে ‘ঢেঁকি’। অথচ অতিতে এই ‘ঢেঁকি’ ছাড়া গ্রাম-গঞ্জকে কল্পনা করা যেত না। পঞ্চাশ বছরের বেশী বয়স্কা মা-বোনদের কাছে বসলে শোনা যায় তখনকার ঢেঁকির প্রচলন সম্পর্কে। তাদের সময়ে ধান, চাল ও আটা ভাঙ্গার একমাত্র উপায় ছিল ‘ঢেঁকি’। কিন্তু আজ ধানকল ও আটাকলের ব্যাপক প্রসারের ফলে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে ‘ঢেঁকি’। এখন আগের মতো গ্রামাঞ্চলে ‘ঢেঁকি’ নেই। শোনা যায় না ঢেঁকির ঢক-ঢক শব্দ। আগে গ্রামের বধুরা ধান ভানিয়ে চাল তৈরী করে নানা রকম সুস্বাধু পিঠা তৈরী করতো। এ সময় বধুরা নানা রকম কিচ্ছা-কাহিনী, খোশ-গল্প ও গীত গাইতো। কিন্তু আজ সেই ঢেঁকি গল্প মাত্র। ফলে নতুন প্রজন্ম ঢেঁকি শব্দটি ভূলতে বসেছে। তারা জানে না ঢেঁকির সেই দাপুটে দিনের কথা। অথচ জকিগঞ্জের একটি গ্রামকে নিয়ে মাত্র কয়েক বছর পূর্বে বহুল প্রচারিত প্রবাদ ছিল ‘ঢেঁকির ঢেকুর ঢেকুর, কোলার বাউ, ভারাভানা দেখলে পরদনা গ্রাম যাও”। আজ সেই গ্রামটিতেও একটি ঢেঁকি নেই। ঢেঁকি হারিয়ে গেলেও এখন উন্নত প্রযুক্তি এসেছে তা খুশির কথা। তবে ঢেঁকিছাটা চাউলের ভাতের মজাটাই ছিল অন্যরকম। ঢেঁকিছাটা চাউলের উপরের আবরন বা খোসা থাকায় তাতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ছিল। আজ জকিগঞ্জের কোথায়ও আর সেই মজাদার ঢেঁকিছাটা চাউল পাওয়া যায় না। যে শিল্পটি গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। কালের আবর্তে তা আজ হারিয়ে গেছে। এক সময় পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান ভানতেন অনেকে। ঢেকি চালাতে সাধারণত দু’জন লোকের প্রয়োজন হতো। এ ক্ষেত্রে সাধারণত মহিলারাই চালাতেন তাদের সাধের ঢেঁকি। একজন ছিয়া সংযুক্ত যা বড় কাটের সাথে লাগানো থাকে তার এক প্রান্তে উঠে যার পাশে হাত দিয়ে ধরার নির্দিষ্ট খুটি ও লটকন থাকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পা দিয়ে চাঁপ দিয়ে ছাড়তেন। অপরজন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে ছিয়ার আঘাতে ধান থেকে চাউল বের হয় সেখানে সতর্কতার সাথে প্রতি আঘাতের পর পর ধান নড়াচড়া করে উল্টে-পাল্টে দিতেন যাতে সবগুলো ধানে আঘাত লাগে। শেষ হলে বা গর্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এগুলো তুলে আবার নতুন ধান দিতেন। মহিলারা ধান বানার ফাঁকে ফাঁকে আঞ্চলিক গীত গেয়ে মনের আনন্দে কাজ করতেন। এ সকল গীতের মধ্যে বহুল প্রচারিত গীত হচ্ছে- “ও ধান বানরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, পিংকী নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া ও ধান বানরে”। “ধান বেচিয়া কিনমু শাড়ী পিন্দিয়া যাইমু বাপর বাড়ী, স্বামী যাইয়া লইয়া আইব গরুর গাড়ী দিয়া ও ধান বানরে”। জানা যায়, আমাদের দেশে সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম রাইসমিল বা যান্ত্রিক ধান থেকে চাল বের করার কল বা মেশিন এর প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। যার দরুন আগের ঢেঁকির ভারাভানার মজা আর নেই। অথচ একটা সময় ছিল বড় গৃহস্থ বা কৃষকের ঘরে অবসর সময়ে বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঢেঁকিতে বা গাইল ছিয়ার মাধ্যমে ধান বানার কাজ করতে হতো। ধান বানতে বানতে অনেক মহিলার হাতে ফুসকা পড়ে যেত। এভাবে ফুসকা পড়তে পড়তে হাতে কড় পড়েও যেত। গরীব মহিলারা বা কাজের মেয়েরা এক আধসের চাল বা ধান পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কেহবা শুধু পেটপুরে খাবার বিনিময়ে ধনিদের ঘরে চাল কুটার কাজে নিয়োজিত তাকতো। যে গৃহস্থ যতো বেশী ধান বা চাউল উৎপাদন করে বিক্রয় করতেন তিনিই এলাকার ততো বড়ো ধনী হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করতেন। তাই বড় বড় গৃহস্থের বাড়ীতে ঢেঁকিতে ধান বানার আওয়াজ তথা ঢেকুর ঢেকুর শব্দ শোনা যেত প্রতিদিন। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেকির ছন্দময় শব্দ। অথচ তখনকার সময় আজকের এই বোরো মৌসুমে জকিগঞ্জের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ঢেঁকির আওয়াজ শোনা যেত। কাজের চাঁপে কারো সাথে কথা বলার উপায় ছিল না। এ প্রসঙ্গে কামালপুর গ্রামের সত্তর বছর বয়স্কা একলিমুন নেছা বলেন, “হায় রে বাবা ইলা দিনও ভারা ভানতে ভানতে দিন-রাইত কিলা গেছে তা খইতাম পারি না। আইজ আল্লায় খততা দেখাইলা। বাড়িত আইয়া টেটকার দিয়া ধান বানিয়া দিয়া যায়গি”।
Share this article :

0 মন্তব্য:

Speak up your mind

Tell us what you're thinking... !

ফেসবুক ফ্যান পেজ

 
Founder and Editor : Rahmat Ali Helali | Email | Mobile: 01715745222
25, Point View Shopping Complex (1st Floor, Amborkhana, Sylhet Website
Copyright © 2013. জকিগঞ্জ সংবাদ - All Rights Reserved
Template Design by Green Host BD Published by Zakigonj Sangbad